হোম / শিক্ষা / কনটেন্ট / শিশু অধিকার / সুরক্ষার অধিকার
ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

সুরক্ষার অধিকার

শিশু সুরক্ষা বিষয়ে কাদের দিকে বেশি নজর দেওয়া উচিত, তা এখানে বলা হয়েছে।

শিশু সুরক্ষা

শোষণ, নিগ্রহ, অমানবিক আচরণ ও অবহেলা --- সমাজের সব শিশুকে এ ধরনের সমস্ত নিপীড়নের হাত থেকে রক্ষা করার ব্যাপারটি সুনিশ্চিত করুন।

সব শিশুরই সুরক্ষার প্রয়োজন। কিন্তু সামাজিক, অর্থনৈতিক, এমনকী ভৌগোলিক কারণের জন্য কোনও কোনও শিশু অন্যদের থেকে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। তাদের প্রতি একটু বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। এই শিশুরা হল :

  • গৃহহীন শিশুরা (যারা গ্যারেজে থাকে/ ফুটপাথে থাকে, উদ্বাস্তু ইত্যাদি)
  • অন্য জায়গা থেকে আসা শিশুরা
  • পথবাসী ও পলাতক শিশুরা
  • অনাথ ও পরিত্যক্ত শিশুরা
  • কর্মরত শিশুরা
  • শিশু ভিখারিরা
  • বারাঙ্গনাদের শিশুরা
  • যে সব শিশু বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণ করেছে
  • পাচার হওয়া শিশুরা
  • জেলে ও কয়েদখানার শিশুরা
  • কয়েদিদের শিশুরা
  • সংঘর্ষের শিকার শিশুরা
  • প্রাকৃতিক বির্পযয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুরা
  • এইচআইভি পজিটিভ ও এইডস্ আক্রান্ত শিশুরা
  • মারণ ব্যধিতে আক্রান্ত শিশুরা
  • পঙ্গু শিশুরা
  • তফশিলি জাতি ও উপজাতি ভুক্ত শিশুরা

শিশু সুরক্ষা : প্রচলিত ধারণা ও বাস্তব

শিশু সুরক্ষা : প্রচলিত ধারণা ও বাস্তব

শিশুদের নিগ্রহ এবং সামাজিক শোষণ সম্পর্কে জনপ্রিয় কিছু প্রচলিত ধারণার কথা নীচে বলা হল-

  • ১. প্রচলিত ধারণা : শিশুরা কখনওই নিগ্রহ বা শোষণের শিকার হয় না। সমাজ তার শিশুদের ভালবাসে।

    বাস্তব: হ্যাঁ এটা সত্যি যে আমরা শিশুদের ভালবাসি কিন্তু কোথাও একটা ফাঁক থেকেই যায়। সারা পৃথিবীর মধ্যে ভারতবর্ষেই সব থেকে বেশি সংখ্যায় শিশুশ্রমিক রয়েছে। যৌন নিগ্রহের শিকার এমন শিশুর সংখ্যা এ দেশেই সবচেয়ে বেশি এবং ০-৬ বছরের শিশুদের মধ্যে আনুপাতিক দিক দিয়ে কন্যাসন্তানের সংখ্যা সবচেয়ে কম। এর থেকে বোঝা যায় এ দেশে শিশুকন্যাদের জীবন কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এমনকী ছোট শিশুদের দত্তকের নামে বিক্রয় করা হয় বা মেরে ফেলা হয়।

    শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ সম্পর্কিত তথ্য অত্যন্ত জঘন্য চিত্র প্রকাশ করে। সরকারি রেকর্ড অনুসারে ২০০২ থেকে ২০০৩ এর মধ্যে শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ ১১.১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এবং অনেক ঘটনা ঘটে যা কখনও খবর হয় না।

  • ২. প্রচলিত ধারণা : বাড়িই শিশুদের সব থেকে নিরাপদ স্থান

    বাস্তব : বাড়িতে শিশুদের উপর যে পরিমাণ অত্যাচার চলে, সেই তথ্য স্পষ্টতই এই বিশ্বাসকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। বাবা-মায়েরা সন্তানদের তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে দেখেন, যে সম্পত্তি তাঁরা যে কোনও ভাবে ব্যবহার করতে পারেন (বা বলা ভালো অপব্যবহার করতে পারেন)।

    বাবা তার নিজের মেয়েকে টাকার জন্য বন্ধুর কাছে বা অচেনা লোকের কাছে বিক্রি করেছে, এমন ঘটনার খবর আমরা আকছারই পাই। শিশুদের যৌননিগ্রহ সংক্রান্ত তথ্য থেকে জানা যায়, পরিবারের মধ্যেই যৌন সঙ্গম, নিগ্রহের সব চেয়ে পরিচিত উদাহরণ। বাবা স্বয়ং নিজের মেয়েকে ধর্ষণ করেছে এমন বহু ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এবং কোর্টেও প্রমাণিত হয়েছে। কন্যাভ্রূণ হত্যা, সদ্যোজাত কন্যাসন্তান হত্যা, অন্ধবিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে শিশু হত্যা, ভারতের কোনও কোনও অঞ্চলে ‘যোগিনী’ বা ‘দেবদাসী’ প্রথার নামে দেব-দেবীর কাছে কন্যাসন্তানকে উৎসর্গ করা --- এগুলো সবই বাড়িতে শিশুদের উপর হিংসার উদাহরণ। খুব ছোট বয়সে কন্যাসন্তানদের বিয়ে দিয়ে দেওয়ার মধ্যে কোনও রকম ভালোবাসা কাজ করে না। বরং এর মধ্যে তাকে যত্ন করা ও বড় করে তোলার দায় এড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপার থাকে। এর ফলে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে বা মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হলেও তা নিয়ে অভিভাবকদের হেলদোল থাকে না।

    এগুলি সবই হয়তো শিশু নিগ্রহের অত্যন্ত চরম উদাহরণ। তবে বাড়িতে শিশুদের ব্যাপক মারধর করাটা দেশের প্রায় প্রতিটি বাড়িরই চেনা ছবি। ধনী-দরিদ্র সব পরিবারেই শিশুদের অবহেলা করাটা একটা সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এর ফলে শিশুদের আচরণগত সমস্যা হচ্ছে, তারা মানসিক অবসাদেরও শিকার হচ্ছে।

  • ৩. প্রচলিত ধারণা : শিশুপুত্রকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই, এদের সুরক্ষার প্রয়োজন নেই।

    বাস্তব: বালকরাও বালিকাদের মতোই শারীরিক ও মানসিক নিগ্রহের শিকার হয়। যদিও সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে বালিকারা কিছুটা নীচে থাকে বলে, তাদের অবস্থাটা বেশি খারাপ। বালকদের স্কুলে এবং বাড়িতে শাস্তি দিতে মারধর করা হয়, অনেককে শ্রমিকের কাজে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, এমনকী বিক্রিও করে দেওয়া হয়। অনেকে যৌননিগ্রহেরও শিকার হয়।

  • ৪.প্রচলিত ধারণা : আমাদের স্কুলে/ গ্রামে এমন হয় না।

    বাস্তব : আমরা সবাই ভাবি শিশু নিগ্রহের ঘটনা অন্যত্র হয়, আমাদের বাড়ি, স্কুল বা গ্রামে বা সম্প্রদায়ে হয় না। এর শিকার অন্যদের ছেলেপুলেরা, আমাদের নয়। গরিব বা শ্রমিক শ্রেণি, উপার্জনহীন বা অশিক্ষিত, এমন পরিবারেই এ সব ঘটে। মধ্যবিত্ত পরিবারে এ সব হয় না। ও সব শহর বা মফঃস্বলে হয়, গ্রামাঞ্চলে হয় না। কিন্তু বাস্তব একেবারেই বিপরীত। নিগৃহীত শিশু আমাদের আশেপাশে সর্বত্রই আছে। আমাদের সাহায্যের বড় প্রয়োজন এদের।

  • ৫. প্রচলিত ধারণা: শিশুদের যারা নিগ্রহ করে তারা মানসিক ভাবে অসুস্থ।

    বাস্তব : এ কথাটি খুবই প্রচলিত যে নিগ্রহকারীরা মানসিক ভাবে অসুস্থ। কিন্তু এটা সত্য নয়। নিগ্রহকারীরা চারিত্রিক দিক থেকে খুবই স্বাভাবিক এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নকারীরা তাদের কাজের পক্ষে নানা যুক্তি দিয়ে থাকে। যে সব লোকে শিশু পাচার করে, তারা সেই শিশুর পরিবারের খুব কাছেরই মানুষ হয়। সেই পরিবারের বিশ্বাসকে ব্যবহার করে তারা তাদের শিশুদের নিয়ে পালিয়ে যায়।

শিক্ষকদের যা জানা উচিত

জাতি, গোষ্ঠী, ধর্ম, সংস্কৃতি, আর্থ-সামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে শিশুদের ওপর নিগ্রহের ঘটনা ঘটে থাকে।

সরকার ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠনের নানা গবেষণা, তথ্য নথিবদ্ধকরণ ও পদক্ষেপ শিশু সুরক্ষা সংক্রান্ত নিম্নলিখিত বিষয়গুলিকে সামনে তুলে এনেছে এবং যেসব শিশুদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া দরকার, তাদেরও নির্দিষ্ট করেছে।

  • লিঙ্গ বৈষম্য
  • জাতপাতের বৈষম্য
  • প্রতিবন্ধকতা
  • কন্যাভ্রূণ হত্যা
  • নবজাতক হত্যা
  • পারিবারিক হিংসা
  • শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন
  • বাল্য বিবাহ
  • শিশু শ্রমিক
  • শিশু যৌনকর্মী
  • শিশু পাচার
  • শিশু বলি
  • স্কুলে শারীরিক নির্যাতন
  • স্কুলে পরীক্ষার চাপ এবং আত্মহত্যা
  • প্রাকৃতিক বিপর্যয়
  • যুদ্ধ ও সংঘর্ষ
  • এইচআইভি/এইডস্

লিঙ্গ বৈষম্য : প্রচলিত ধারণা ও বাস্তব

অসংখ্য প্রচলিত ধারণার বন্ধনে আমরা বাঁধা পড়ে আছি। কেবলমাত্র বাস্তবটা জানলেই আমরা দু’য়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারব!

প্রচলিত ধারণা: যে কোনও মূল্যে ছেলে চাই, কিন্তু তার জন্য চার পাঁচটা মেয়ের জন্ম দেব কেন ?

কন্যাসন্তান কে বড় করা মানে প্রতিবেশীর বাগানে জল দেওয়া। আপনি তাদের বড় করবেন, সকল রকম বিপদ থেকে তাদের রক্ষা করবেন, তাদের বিয়ে ও বিয়ের পণের জোগাড় করবেন কিন্ত্তু অবশেষে তারা আপনাকে ছেড়ে চলেই যাবে। ছেলেরা নিদেন পক্ষে বংশরক্ষা করবে, বৃদ্ধ বয়সে বাবা মায়ের দেখাশোনা করবে এবং বাবা মায়ের শেষকৃত্য তারাই সম্পাদন করবে।

কন্যাসন্তানকে লেখাপড়া শেখানোর কোনও কারণ নেই। তাদের স্বাধীনতা দেওয়ার বা তাদের ইচ্ছানুসারে কোনও কাজ করতে দেওয়ার মানেই হয় না যত দিন না তাদের বিয়ে হয় । কারণ এ সমস্তই পরিবারের অতিরিক্ত দায়।

বাস্তব: পিতৃতান্ত্রিক সমাজের এটাই নিয়ম। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সময় এসেছে। সাধারণ মানুষ তার ছেলের বিয়েতে যতটা খরচ করে মেয়ের বিয়েতে ততটাই খরচ করে। কিন্তু চালাকি করে বলা হয় “আমরা মেয়ের বিয়েতে পণ দিলাম”। মূলত মেয়েকে এটা পরোক্ষে বলে দেওয়া হয় পৈতৃক সম্পত্তিতে তোমার কোনও অধিকার নেই।  সব সময় মনে রাখবেন পণ দেওয়া ও নেওয়া দু’টোই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মেয়েদের পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করাটাও বেআইনি।

যে কোনও ক্ষেত্রেই জীবনের বাস্তবতাকে আমাদের গ্রহণ করতেই হবে। বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে গেলেই বুঝতে পারা যায় ছেলেরা বাবা-মায়ের দেখাশোনা কতদূর করে। বরং অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের দেখাশোনা মেয়েরাই করছে।

মেয়েদেরও ছেলেদের মতোই বেঁচে থাকার অধিকার, উন্নতির অধিকার, সুরক্ষার অধিকার এবং কোনও কিছুতে অংশ গ্রহণের অধিকার রয়েছে।

এ সব অধিকার থেকে মেয়েদের বঞ্চিত করা মানেই লিঙ্গ বৈষম্য এবং দারিদ্রের দুষ্টচক্রকে চিরস্থায়ী করা ।

বহু যুগ ধরে মেয়েরা জীবনের যে সব ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার, তার মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। আমরা সব সময় আমাদের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর কথা ভুলে যাই। তিনি বলেছিলেন - “এক জন পুরুষকে শিক্ষিত করা মানে এক জন মানুষকে শিক্ষিত করা, কিন্তু এক জন নারীকে শিক্ষিত করা মানে গোটা সমাজকে শিক্ষিত করা” ।

কন্যাসন্তানকে যদি সুযোগ সুবিধা দিয়ে বড় করা হয়, খুব সহজেই তারা ভাল এবং মন্দ সম্পর্কে ধারণা করতে পারে এবং জীবন সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু আমরা মেয়েদের স্বাধীনতা দিতে ভয় পাই। এর একটাই সমাধান। আমাদের এটা দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করতে হবে যে, যে কোনও মানুষের মতোই শিশুকন্যারও মানবাধিকার রয়েছে। যদি মেয়েদের নিরাপত্তা এবং রক্ষণাবেক্ষণ জাতীয় সমস্যা হয়, তবে এটা মনে রাখা জরুরি যে মেয়েদের ক্ষমতায়ন না করাটা, তাদের দুর্বলতাকে বাড়ানোর সামিল।

২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, দেশে প্রতি ১০০০ পুরুষে ৯৪০ জন মহিলা রয়েছে। এই লিঙ্গ অনুপাত থেকে দেখা যাচ্ছে , ২০০১ সালের থেকে অবস্থার উন্নতি হয়েছে। ২০০১ সালে ১০০০ পুরুষে মহিলার সংখ্যা ছিল ৯৩৩। দশকের পর দশক ধরে ভারতে পুরুষের তুলনায় মহিলার পরিমাণ কমেছে। কিন্তু গত দু’দশকে পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে। গত পাঁচ দশকে প্রতি ১০০০ পুরুষে মহিলার সংখ্যা ৯৩০ থেকে শুরু করে বর্তমানে ৯৪০-এ পৌঁছেছে।

বাল্যবিবাহ ও শিশু পাচার

আমাদের দেশ ও মধ্য প্রাচ্যের বৃদ্ধ পুরুষেরা আইনি ভাবেই এ দেশের ছোট মেয়েদের বিয়ে করে এবং মেয়েরা প্রায়শই বেশ্যাবৃত্তি সহ বিবিধ শোষণ মূলক পরিস্থিতির শিকার হয়। আসলে বিবাহ এ ক্ষেত্রে শিশু পাচারের একটি উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যার দ্বারা বালিকারা শিশু শ্রমিকে পরিণত হয় ও বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। এ নিইয়ে সমাজে বহু ভুল ধরণা এই একবিংশ শতাব্দীতেও বহাল রয়েছে। অনেক সৎ উদ্যোগও এ জন্য যথাযথ ফলাফল দিতে পারে না।

নিগ্রহ থেকে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই বাল্যবিবাহ প্রয়োজন, একথা সম্পূর্ণ ভুল। নিগ্রহ থেকে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই বাল্যবিবাহ প্রয়োজন, একথা সম্পূর্ণ ভুল। সত্যি কথা বলতে কি, এটা পরিবারের মধ্যে ও বাইরে থেকে শিশুকন্যার উপর সমস্ত রকম নির্যাতন চাপিয়ে দওয়ার সামিল। তাকে ক্রমাগত বলা হয় তুমি বিশ্বাস করো এবং মেনে চলো। বাল্যবিবাহ শিশু-ধর্ষণকেই প্রশ্রয় দেয়, কারণ শিশুরা কখনওই যৌন সংসর্গে লিপ্ত হওয়ার মতো পরিপক্ক থাকে না।

বিবাহিত বা অবিবাহিত কোনও মহিলাকেই কোনও বাইরের লোক সুরক্ষা দিতে পারে না। বিবাহিত বা অবিবাহিত, বৃদ্ধা বা তরুণী, পর্দানসীন বা পর্দানসীন নয়, সব মহিলাই ধর্ষণ এবং যৌন নিগ্রহের শিকার হতে পারেন। যে ভাবে মেয়েদের উপর অত্যাচারের হার বাড়ছে তাতে এটাই প্রমাণিত হয়।

যখন আমাদের গ্রামে কোনও পর্দানসীন অশিক্ষিত বিবাহিত মহিলা ধর্ষিত হন, তাঁরা অশিক্ষিত বলেই যে ধর্ষিতা হয়েছেন তা নয়, তাঁরা জাতিগত কারণে বা গোষ্ঠী সংঘর্ষের কারণেই ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হন।

সব শেষে যেটা বলতে হয়, এটা কখনওই বলা যায় না যে বাল্যবিবাহ পণপ্রথা সমস্যার সমাধান করতে পারে। আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে ছেলের বাড়ির লোকেরা সব সময় এ কথাই ভাবে যে মেয়ের বাড়ির লোকেরা তাদের প্রতি বাধ্য থাকবে এবং তারা যখন যা চাইবে তা দেবে। যদি পণ বিয়ের সময় না নেওয়া হয় তবে বিয়ের পর ছেলের বাড়ির লোকেরা তাদের সমস্ত চাহিদা মেয়েটির উপর চাপিয়ে দেয়।

উৎস : পোর্টাল কন্টেন্ট দল

শিশুশ্রমিক : প্রচলিত ধারণা ও বাস্তব

প্রচলিত ধারণা: শিশুশ্রমের সমস্যার কোনও সমাধান সম্ভব নয়। দরিদ্র বাবা-মা তাঁদের বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে চান না, বরং তাঁরা তাদের কাজে পাঠান কিছু রোজগার করে পরিবারে দেওয়ার জন্য। এ সমস্ত বাচ্চার কাজ করা ছাড়া অন্য কিছু উপায় থাকে না। কারণ তা না করলে তাদের পরিবার উপবাসে থাকবে। এ ছাড়াও কাজ করলে তারা তাদের ভবিষ্যতের রোজগারের জন্য কিছু দক্ষতা অর্জন করে।

বাস্তব: এ সমস্ত কথা যখন আমরা শুনব, তখন আমরা নিজেদেরই প্রশ্ন করব, যে কেন কিছু গরিব মানুষ সমস্ত বাধা অতিক্রম করে তাদের বাচ্চাকে স্কুলে পাঠাচ্ছে এবং কেন কিছু গরিব মানুষ পাঠাচ্ছে না। সত্যটা এই যে যারা নিজেদের সুবিধার জন্য একের পর এক বাচ্চা জন্ম দেয়, দারিদ্র্য তাদের কাছে একটা অজুহাত মাত্র। কিছু সামাজিক কারণ শিশুশ্রমিক তৈরি করে। শ্রেণি বৈষম্যের শিকার হওয়ায় সমাজের প্রান্তিক মানুষেরা সব সুযোগ পান না। আমরা জানি শিশু সহ পরিবারের সকলে কাজ করলেও পরিবারে অনাহার থাকে। অন্যায্য সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বিন্যাসই এর কারণ।

প্রত্যেক বাবা-মা চান তাঁদের সন্তানরা লেখাপড়া শিখুক। অন্তত প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত হোক। অশিক্ষিত বাবা-মায়ের জন্য স্কুলে ভর্তি করার পদ্ধতিটি অত্যন্ত জটিল। বিশেষ করে প্রমাণপত্রগুলির ব্যাপার। জন্ম তারিখ, জাতের শংসাপত্র --- ইত্যাদি সব কিছু স্কুলের ভর্তির পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যেখানে বাচ্চারা বংশের প্রথম হিসাবে স্কুলে যাচ্ছে বা বাচ্চাদের বাবা-মায়েরা অশিক্ষিত, সেখানে বাচ্চাদের পক্ষে পাঠক্রম কঠিন হয়ে দাঁড়ায় । সে ক্ষেত্রে বাবা-মায়েরা পড়াশোনায় কোনও সাহায্য করতে পারেন না। স্কুলে শাস্তি, জাত বৈষম্য এবং শৌচাগার বা খাবার জলের মতো প্রাথমিক সুযোগসুবিধার অভাব প্রভৃতির জন্যও শিশুরা স্কুলে আসা বন্ধ করে। কন্যাসন্তানের প্রতি আরও কম যত্ন নেওয়া হয়। কারণ শহর ও গ্রামাঞ্চলে শিশুদের যথাযথ ভাবে লালন করার সুযোগ অপ্রতুল এবং লিঙ্গ বৈষম্য মানুষের মনের গভীরে রয়েছে।

যে সব শিশু বাইরে কাজ করে এবং স্কুলে যায় না, তারা সারা জীবন নিরক্ষর এবং কাজের ক্ষেত্রে অদক্ষ হয়েই থাকে। কারণ শিশুরা অদক্ষ শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়াও বিশেষ কিছু বিপজ্জনক কাজে ক্ষতিকারক রাসায়নিক তরল এবং উপাদানের ব্যবহার, কাজের দীর্ঘ সময়, কাজের ধরন শিশুর স্বাস্থ্যহানি করে এবং তাদের উন্নতিতে বাধা দেয়।  শিশুশ্রমিকদের অস্তিত্ব ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক অধিকারভুক্ত ২১ ক অনুচ্ছেদের বিরোধী। এতে বলা হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষা ৬-১৪ বছর বয়সি প্রত্যেকটি শিশুর মৌলিক অধিকার।

এটা অবশ্যই মনে রাখা উচিত, এক জন শিশুশ্রমিককে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া মানে এক জন প্রাপ্তবয়স্কের কর্মসংস্থান হওয়া। ভারতবর্ষে জনসংখ্যার একটা বড় অংশ বেকার যারা শিশুদের স্থান অধিকার করতে পারে এবং শিশুদের জন্য একটা আনন্দপূর্ণ মুক্ত শৈশব উপহার দিতে পারে।

ভারতবর্ষে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিশুশ্রমিক রয়েছে। ২০০১-এর আদমসুমারি থেকে জানা যায়, ৫ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের মধ্যে ১.২৫ কোটি শিশু বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত। যদিও এনজিও-দের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই সংখ্যাটি আরও বেশি। কারণ তারা প্রত্যন্ত গ্রামে এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করে। সেখানে শ্রমিক হিসাবে বহু শিশুর নাম জনগণনা সংক্রান্ত তথ্যে নথিভুক্ত করানো হয় না।

শিশুদের কায়িক শ্রমে লাগানোর জন্য তাদের পাচার করা হয়, কেনাবেচাও করা হয়। এ ক্ষেত্রে দালালরা প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে পরিবারের কাছে ভালো মানুষ সেজে শিশুদের নিয়ে আসে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের পাচার করে। বাংলা ও বিহার থেকে শিশুদের নিয়ে যাওয়া হয় কর্নাটক, দিল্লি এবং মুম্বইয়ে, সুতোর কাজ করানোর জন্য । তামিলনাড়ু থেকে উত্তরপ্রদেশে শিশুদের নিয়ে যাওয়া হয় মিষ্টি তৈরির জন্য এবং সুরাতে নিয়ে যাওয়া হয় রত্ন ও হিরে কাটা এবং পালিশের জন্য। এদের মধ্যে শত শত শিশু মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তদের বাড়িতে চাকর হিসেবে কাজ করে।

শিশুদের যৌন নিগ্রহ

শিশুদের যৌন নিগ্রহ

প্রচলিত ধারণা : শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনা আমাদের দেশে বিরল। সবটাই সংবাদ মাধ্যমের প্রচার যা সমাজের পক্ষে ক্ষতিকারক। বয়ঃসন্ধিক্ষণের বাচ্চারা যৌন সংসর্গ নিয়ে কল্পনা করতে ভালোবাসে, তা-ই নিয়ে গল্প তৈরি করে এবং মিথ্যে বলে যে তারা যৌন নিপীড়নের শিকার। যদি বা এ ধরনের ঘটনা কিছু ঘটেও থাকে তা হয় চরিত্রহীন এবং খারাপ মেয়েদের ক্ষেত্রে।

বাস্তব: কয়েক মাস এবং কয়েক দিন বয়সের শিশুও যৌন নিপীড়নের শিকার। যদিও মনে করা হয় যে মেয়েরাই সব থেকে বেশি ভুক্তভোগী এ ক্ষেত্রে, কিন্তু ছেলেরাও এর শিকার হয়।

মানসিক এবং শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী শিশুদের বিপদ সব থেকে বেশি। কারণ তারা দুর্বল। শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন কোনও লিঙ্গ, জাতি, শ্রেণি, গোষ্ঠী মেনে হয় না। শহরে, গ্রামে সর্বত্রই এই ঘটনা ঘটে।

কী ভাবে শিশুরা যৌন নিগ্রহের শিকার হয় ?

  • পুরুষাঙ্গ দিয়ে যৌন সঙ্গম করা বা ধর্ষণ করা বা শরীরের অন্য কোনও অঙ্গ বা বস্তু ব্যবহার করা
  • শিশুদের অশ্লীল ছবি দেখানো বা অশ্লীল কিছু তৈরিতে ব্যবহার করা
  • শুধুমাত্র যৌন তৃপ্তির জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনও কিছু দিয়ে বা শরীরের কোনও অংশ দিয়ে শিশুদের শরীর স্পর্শ করা
  • যৌন তৃপ্তির জন্য যৌনাঙ্গ বা শরীরের অন্য কোনও অঙ্গ শিশুদের দেখানো বা ইঙ্গিত করা
  • অন্যের যৌনক্রিয়া দেখে তৃপ্তি লাভ করার জন্য একাধিক শিশুকে পারস্পরিক সংসর্গে লিপ্ত করতে বাধ্য করা
  • উত্তেজক এবং অশ্লীল মন্তব্য করা এবং যৌন উদ্দীপক অঙ্গভঙ্গি করা।

এই নিগ্রহের যে দিকটা সব চেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ করে, তা হল নিগ্রহকারীরা শিশুদের সঙ্গে ভদ্র, ভাল ও স্নেহপূর্ণ ব্যবহার করে। ফলে শিশুরা নিজেদেরই অপরাধী ভাবে এবং প্রত্যেককেই অবিশ্বাস করতে শুরু করে, এমনকী নিজেকেও।

এক জন শিশু পরিচিত এবং অপরিচিত ব্যক্তি দ্বারা অত্যাচারিত হতে পারে।  এ ধরনের ঘটনার ৯০ শতাংশ শিশুদের পরিচিত ব্যক্তি দ্বারাই হয়। অত্যাচারী ব্যক্তি প্রথমে সম্পর্ক ও বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে তার ক্ষমতাকে অপব্যবহার করে। এবং অনেক ক্ষেত্রেই খুব কাছের মানুষ এ ধরনের কাজ করে -- যেমন বাবা, ভাই, সম্পর্কিত ভাই, কাকা, মামা, প্রতিবেশী। যখন নিগ্রহকারী পরিবারেরই লোক হয় তখন তাক বলে অজাচার।  যে দিন থেকে সমাজ গঠিত হয়েছে, সে দিন থেকেই সমাজে যৌন নিপীড়ন রয়েছে। যৌনব্যবসার জন্য মেয়েদের বিক্রি করা, দেবদাসী ও যোগিনী প্রথার মতো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক প্রথা যেমন এর উদাহরণ। যদিও দীর্ঘ সময় ধরে এ সব ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাদের মধ্যে সমীক্ষা করে দেখা গেছে শতকরা ৭৫ জন মহিলা শৈশব অবস্থায় যৌন নিপীড়নের শিকার। এদের মধ্যে অধিকাংশ মহিলাই পরিচিত বা আত্মীয়দের দ্বারা এই নিপীড়নের শিকার। সংবাদমাধ্যমের বাড়াবাড়ির প্রচলিত ধারণাটি অস্বস্তিকর সত্যকে এড়ানোর জন্যই তৈরি।

যে পুরুষেরা শিশুদের প্রতি এ ধরনের যৌন নিপীড়ন চালায় তারা তাদের স্ত্রী অথবা সঙ্গিনীদের সঙ্গে করার পাশাপাশি এটা করে, তাদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে নয়। অনেকে যেমন মনে করেন, তারা মানসিক ভাবে অসুস্থ, মোটেই তা নয়। এরা খুবই স্বাভাবিক এবং বিচিত্র প্রকৃতির। শিশুদের যৌন নিপীড়নকে তারা যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে, এটা কোনও অন্যায় নয়।

কিছু কিছু পুরুষ মানুষ আবার লোকজনের সামনেই এই ধরনের ব্যবহার করে থাকে।  শিশুরা এত ভয় পেয়ে যায় যে তারা কিছুতেই তাদের এই লাঞ্ছনার কথা বলে না। নিপীড়িতর বয়স কত এ কথা কেউ ভাবে না। অত্যাচারী সব সময় ক্ষমতাবান হয়, অত্যাচারীর ধূর্ততার কোনও থই পায় না নিপীড়িত। যে শিশুটির উপর অত্যাচার করা হয় তার কোনও ক্ষমতাই থাকে না তা প্রতিরোধ করার, বিশেষত যদি সেই অন্যায়কারী পরিবারের লোক হয়। এমনকী মায়েরাও ঘটনা জেনে প্রতিবাদ করতে পারেন না কারণ তাঁরা ক্ষমতাহীন। পরিবার ভেঙে যাওয়ার ভয়ে অথবা তাঁর কথা কেউ বিশ্বাস করবে না, এই ভেবে তাঁরা চুপ করে থাকেন। পরিবারের বড়রা ও বাবা-মা, এমনকী সমাজও পুরো ব্যাপারটাকেই উপেক্ষা করে অথবা অস্বস্তি এড়াতে পুরো ব্যাপারটাই অস্বীকার করে।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিশুদের উপর এই অত্যাচারের ঘটনা কিন্ত্ত সত্য বলে প্রমাণিত হয়। সব রকমের শিশু নিপীড়নকে অস্বীকার করা এবং শিশুদের কল্পনা বলে মনে করে সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা, আজ আমাদেরই কটাক্ষ করছে।

শিশুরা ভীষণ সরল এবং অনুভুতিপ্রবণ। শিশুদের যৌনতা সম্পর্কে কোনও ধারণাই থাকে না এবং এ ব্যাপারে তাদের কোনও ভাবাবেগও থাকে না। এমনকী যদি কেউ এ ব্যাপারে ওয়াকিবহাল হয় তবুও তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। এক জন যৌনকর্মীও ধর্ষিতা হতে পারেন সে ক্ষেত্রে আইন তার হয়েই কথা বলবে। এ ধরনের অত্যাচারিত শিশুদের দোষারোপ করে আমরা অপরাধীকে প্রশ্রয় দিই।

‘অনুমতি’ ছিল কি ছিল না, এই প্রশ্ন শিশুদের ক্ষেত্রে ওঠেই না। আইনানুসারে, ১৬ বছরের নীচে মেয়ের সঙ্গে যৌন সঙ্গম করা মানে তাকে ধর্ষণ করা।

যখন শিশুরা নিগ্রহকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে তখন তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তাদের আত্মবিশ্বাসের উপর অনাস্থা প্রকাশ করা হয়। এই জন্য শিশুদের মনে অন্যায়বোধ জাগে এবং তারা নিজেদের দায়ী মনে করে। তারা ভাবে কোনও ভাবে হয়তো নিগ্রহকারীর প্রতি তাঁর আচরণেই এমন কাণ্ড ঘটেছে।

সূত্র: সেমান্টিক্স অর সাবস্ট্যান্স ? সাবগ্রুপ আগেন্সট দ্য সেক্সচুয়াল এক্সপ্লয়টেশন অফ চিলড্রেন, এনজিও গ্রুপ ফর দ্য কনভেনশন অন দ্য রাইটস অফ দ্য চাইল্ড, জানুয়ারি, ২০০৫।

শিশুদের উপর যৌন নিপীড়নের প্রভাব

শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের প্রভাব দু’ধরনের হতে পারে। স্বল্পকালীন এবং দীর্ঘকালীন

  • শারীরিক ক্ষত যেমন ছড়ে যাওয়া, কামড়ানো, কেটে যাওয়া ইত্যাদি, যৌনাঙ্গ থেকে রক্তক্ষরণ এবং অন্যান্য শারীরিক আঘাত
  • কখনও কখনও শিশুরা ভয় পায়, অপরাধবোধে, অবসাদে ভোগে, নিজেদের দোষী ভাবে এবং ধীরে ধীরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
  • অনেক সময় শিশুই পরিণত বয়সে পৌঁছে নানা সমস্যায় পড়ে এবং ঘন ঘন যৌনক্রিয়ায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
  • এ ছাড়াও এ সমস্ত বিকৃত যৌনতার শিকার শিশুরা অপরের প্রতি বিশ্বাস হারায়, যার ফল তাদের নিজেদের জীবনের উপরেও পড়ে, যদি না তাদের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দ্বারা চিকিত্সা করানো হয়।

শিক্ষাব্যবস্থায় নিপীড়ন

শিক্ষাব্যবস্থায় নিপীড়ন

প্রচলিত ধারণা : কখনও কখনও নিয়মানুবর্তিতা শেখানর জন্য শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বাবা-মা এবং শিক্ষকের অধিকার আছে শিশুদের নিয়মানুবর্তিতা শেখানোর।

বাস্তব: কথায় বলে আদরে বাঁদর হয়। অতিরিক্ত আদর শিশুকে খারাপ করে তোলে , বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক এটাই শিখে বড় হয়েছেন। যে সব প্রাপ্ত বয়স্ক ছোটবেলায় বাবা-মা বা শিক্ষকদের হাতে মার খেয়েছেন, তাঁরা মনে করেন শিশুদের মারাটা তাঁদের অধিকারের মধ্যে পড়ে। ছোটবেলার কথা তাঁরা ভুলে যান, যখন মার খেয়ে বা অসম্মানজনক শাস্তি পেয়ে তাঁরা মানসিক আঘাতে ভুগতেন।

নিয়মানুবর্তিতা শেখানোর নামে শিশুকে হামেশাই দৈহিক শাস্তি দেওয়া হয় । এ ধরনের শাস্তি তারা তাদের বাবা-মা ও স্কুলের শিক্ষক এবং অশিক্ষক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই পেয়েই থাকে। প্রায় প্রত্যেকটি স্কুলেই এই ধরনের শাস্তি দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। এবং অধিকাংশ বাবা-মাই ছেলেমেয়েদের মারধর করেন।

নিয়মানুবর্তিতার নামে কখনও কখনও শিশুদের হাড় বা দাঁত ভেঙ্গে দেওয়া হয়, তাঁদের চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়, তাদের সঙ্গে চূড়ান্ত অমানবিক আচরণ করা হয়।

দৈহিক শাস্তি

আঘাত করার উদ্দেশ্যে নয়, শিশুকে সংশোধন উদ্দেশ্যে তাকে ব্যথা দিতে যে বল প্রয়োগ করা হয় তাকেই দৈহিক শাস্তি বলে।

শাস্তির প্রকারভেদ-
দৈহিক শাস্তি
  • ১. চেয়ার এর মতো করে দাঁড় করিয়ে দেওয়া
  • ২. স্কুল ব্যাগ মাথার উপর ধরে রাখতে বলা
  • ৩. সূর্যের নীচে সারা দিন দাঁড় করিয়ে রাখা
  • ৪. হাঁটুর উপর বসিয়ে রেখে কাজ করানো
  • ৫. বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা
  • ৬. হাত তুলে দাঁড় করিয়ে রাখা
  • ৭. মুখে পেন্সিল ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা
  • ৮. পায়ের তলা দিয়ে হাত নিয়ে কান ধরা
  • ৯. হাত বেঁধে রাখা
  • ১০. ওঠ বোস করানো
  • ১১. বেত মারা ও চিমটি কাটা
  • ১২. কাল মুলে দেওয়া
মানসিক শাস্তি
  • ১. বিপরীত লিঙ্গের দ্বারা চড় মারা
  • ২. গালাগালি করা, অত্যাচার করা এবং অপদস্থ করা
  • ৩. শিশুর অভ্যব্যতার কথা তার জামায় লিখে সারা স্কুল ঘোরানো
  • ৪. ক্লাসে সবার পেছনে দাঁড়াতে বলে কাজ শেষ করতে বলা
  • ৫. দু’দিনের জন্য তাদের স্কুল থেকে বহিস্কার করা
  • ৬. ‘আমি বোকা’, ‘আমি গাধা’, ইত্যাদি লিখে পিঠে কাগজ সেঁটে দেওয়া
  • ৭. প্রতি ক্লাসে শিশুটিকে নিয়ে গিয়ে অপদস্ত করা
  • ৮. ছাত্রের গায়ের জামা খুলে নেওয়া
নেতিবাচক শাস্তি
  • ১. টিফিনের সময় ছুটি না দেওয়া
  • ২. অন্ধকার ঘরে বন্ধ করে রাখা
  • ৩. অভিভাবকদের ডেকে পাঠানো বা পড়ুয়াদের আচরণের ব্যাখ্যা চেয়ে বাবা-মায়ের কাছ চিঠি আনতে বলা
  • ৪. বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া বা স্কুলের গেটের বাইরে বের করে দেওয়া
  • ৫. ছাত্রদের ক্লাসরুমের মেঝেতে বসতে বাধ্য করা
  • ৬. স্কুল চত্বর শিশুটিকে দিয়ে পরিষ্কার করান
  • ৭. স্কুলের মাঠে শিশুটিকে দৌড় করানো
  • ৮. শিশুটিকে অধ্যক্ষের কাছে পাঠানো
  • ৯. শিশুটিকে ক্লাসের মধ্যে প্রবল বকাবকি করা
  • ১০. যতক্ষণ না শিক্ষক আসেন ততক্ষণ তাকে দাঁড় করিয়ে রাখা
  • ১১. মৌখিক ভাবে সতর্ক করা বা ডাইরিতে সতর্কবার্তা লিখে দেওয়া
  • ১২. শিশুটিকে টিসি দেওয়ার ভয় দেখানো
  • ১৩. তাদেরকে খেলাধুলো থেকে বঞ্চিত করা
  • ১৪. নম্বর কেটে নেওয়া
  • ১৫. তিন দিনের দেরি করে আসাকে, এক দিনের অনুপস্থিতির সমান ধার্য করা
  • ১৬. অহেতুক বেশি কার্যভার আরোপ করা
  • ১৭. জরিমানা দিতে বাধ্য করা
  • ১৮. ক্লাসে ঢুকতে বারণ করা
  • ১৯. গোটা দিন, গোটা সপ্তাহ বা সারা মাস ধরেই মেঝেতে বসতে দেওয়া
  • ২০. শিশুদের নিয়মানুবর্তিতা খাতায় একটি কালো বিন্দু দেওয়া

সূত্র : দৈহিক শাস্তি, স্কুলে শিশুর অধিকার লঙ্ঘন - লেখক - অধ্যাপক মাদাভুসি শ্রীধর - নলসর ইউনির্ভাসিটি অফ ল - হায়দরাবাদ

দৈহিক শাস্তি কী ভাবে শিশুর ক্ষতি করে

এটার একটা নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে শিশুদের মনে। এর ফলে তারা ঘৃণা করতে শুরু করে, ভয় পায় ও আতঙ্কিত হয়।

এ ধরনের শাস্তি শিশুদের মনে রাগের উদ্রেক করে এবং তারা হীনমন্যতায় ভোগে। শিশুকে অসহায় ও অপদস্থ করে। শিশুর আত্মমর্যাদা বোধ ও অহং-কে আঘাত করার মধ্য দিয়ে শিশুকে বিচ্ছিন্ন বা আক্রমণাত্মক করে তোলা হয়।

এতে শিশুরা মনে করে হিংসা ও প্রতিশোধই সমস্যা সমাধানের এক মাত্র পথ।  বড়রা যা করে শিশুরা তা অনুকরণ করে। শিশুরা এটা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে হিংসার প্রয়োগে কোনও ভুল নেই। তারা তাদের বাবা মা বা শিক্ষককেও অসম্মান করে। শারীরিক অত্যাচারে ভুক্তভোগী শিশু স্বাভাবিক ভাবে বড় হয়ে নিজের শিশু, স্ত্রী/স্বামী বা বন্ধুদের ওপর অত্যাচার করে।

দৈহিক শাস্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে কোনও কাজেই দেয় না। এই শাস্তি দিয়ে কাউকে অনুপ্রাণিত করা যায় না। এটা শিশুর ভালোর থেকে ক্ষতি করে বেশি।  শিশুকে শাস্তি দিলে সে হয়তো সাময়িক সময়ের জন্য নিয়মানুবর্তিতা শেখে, কিন্ত্ত আদতে সে বিষয়টি অনুধাবনই করতে পারে না এবং বুদ্ধিমানও হয়ে ওঠে না। এর আরও খারাপ দিক রয়েছে। বহু পথশিশু, তাদের স্কুল,বাড়ি বা পরিবার থেকে পালিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে স্কুলের শারীরিক শাস্তিকে চিহ্নিত করেছে।

শিশুকে নিয়মানুবর্তিতা শেখানোর এই মানে নয় যে তার বিকশিত হওয়ার ও অংশগ্রহণের অধিকারটাই আমরা ছিনিয়ে নেব। সত্যি বলতে কি, শিশুর অংশগ্রহণের অধিকার মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়েই শৃঙ্খলা রক্ষা সম্ভব। শিশুর শারীরিক শাস্তি কোনও ধর্ম বা আইনে অনুমোদন করে না। কোনও ভাবেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারছেন না বলেই, কোনও ব্যক্তি শিশুদের শারীরিক শাস্তি দেওয়ার আইনি বা নৈতিক অধিকার পেতে পারেন না।

  • নিয়মানুবর্তিতা কাউকে শেখানো যায় না এটা শিখে নিতে হয়
  • নিয়মানুবর্তিতা একটা আচরণ, চরিত্র, দায়বদ্ধতা, প্রতিশ্রুতি
  • নিয়মানুবর্তিতা হল একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়, সেটিকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা একটি বাহ্যিক প্রক্রিয়া।

পরীক্ষার চাপ ও পরীক্ষার্থীদের আত্মহত্যা

প্রচলিত ধারণা: ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থা এত বেশি মেধাবী ছাত্র তৈরি করে যে সারা বিশ্বের এ ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে। এর ফলস্বরূপ অনেক মেধাবী ছাত্র, বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার এবং পেশাদার সাফল্যের সঙ্গে পশ্চিমের দেশগুলিতে রয়েছে এবং এদের মধ্যে অনেকেই সেই দেশে খুব ভালো কাজ করছে। কঠিন নিয়মানুবর্তিতা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাই হল সাফল্যের চাবিকাঠি। সব বাবা-মা ই ভালো ফলের আশায় নিজেদের সন্তানদের ভাল স্কুলে দিতে চায়।

বাস্তব : এটাতে কোনও সন্দেহ নেই ভারতে মেধাবী ছাত্রের সংখ্যা অনেক। এর পুরো কৃতিত্ব বর্তমানের স্কুলব্যবস্থার বা শিক্ষাব্যবস্থার নাকি পারিবারিক বা সামাজিক চাপ থাকা স্বত্ত্বেও জীবনে উন্নতি করার ইচ্ছা শক্তির। প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা ক্রমেই বাড়ছে। প্রত্যেকটি ভালো স্কুল এবং শিক্ষকদের লক্ষ্য হচ্ছে ভালো ফল। এই অপরিসীম চাপের মোকাবিলা করার ব্যাপারে বাচ্চাদের সাহায্য করার অক্ষমতা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অবসাদ বাড়াচ্ছে। এই অবসাদই আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়াচ্ছে। মেধার অবক্ষয় ঘটছে। এই বাস্তব সম্পর্কে এখনও যদি আমরা সচেতন না হই তবে খুব শীঘ্রই এক উজ্জ্বল প্রজন্মকে আমরা হারাব।  কিছু কিছু ছাত্রের কাছে দশ বা বারো ক্লাসের পরীক্ষার পরই জীবন শেষ হয়ে যায়।  সিবিএসই বোর্ডের দশম এবং দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের ৫ দিনের মধ্যেই রাজধানী দিল্লিতে আধ ডজন ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। আপনি যখন এই খবরটি পড়ছেন, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার জন্য এর মধ্যে আরও অনেকেই হয়তো এই পথ বেছে নিয়েছে।

আত্মহত্যার ঘটনা বেড়ে যাওয়াটা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আরও গভীর অস্থিরতার প্রতিফলন। “অতীতে বয়‌ঃসন্ধির সঙ্গে অবসাদকে যুক্ত করে দেখা হত না। অতি সম্প্রতি এই উপলব্ধির জন্ম হয়েছে, বয়সন্ধির সময়ও অবসাদ হয়ে থাকে। ” এ কথা বলেছেন ডঃ আর সি জিলোহা, অধ্যক্ষ এবং বিভাগীয় প্রধান, মনোবিজ্ঞান, জি বি পন্থ ও মৌলনা আজাদ মেডিক্যাল কলেজ। এই ধরনের সমস্যা তৈরি হওয়ার কারণ হল, বয়সন্ধির সময়টা এমন একটি সময় যখন এদের প্রাপ্তবয়স্ক বলা যায় না আবার শিশুর পর্যায়েও ফেলা যায় না।

......... জনৈকা টেলি কাউন্সিলর শ্রীমতি শর্মা বলেন, কাউন্সিলিং-এর প্রয়োজনটা মেনে নেওয়া, বাবা-মায়ের এবং শিক্ষক-শিক্ষিকার পক্ষে খুবই জরুরি । ........... পরীক্ষার ফলাফলই জীবনের শেষ কথা নয়। খারাপ ফলাফলের পরও জীবন পড়ে রয়েছে। এ কথাটা বাবা মা এবং শিক্ষকদের বুঝতে হবে” ।

সূত্র : স্মৃতি কাক, দ্য ট্রিবিউন , চণ্ডীগড়, ৩১ মে ২০০২।

এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে, সব অভিভাবকই এমন স্কুলে ছেলেমেয়েদের পাঠাতে চান, যেগুলিতে ভালো রেজাল্ট হয়। কিন্তু কেউ কি তাঁদের এ প্রশ্ন করেছেন, এই ব্যাপারটা সন্তানদের সুস্থ থাকা, এমনকী বেঁচে থাকার থেকেও জরুরি কি না ? কোনও অভিভাবকই তাদের ছেলে মেয়েকে হারাতে চান না। এর থেকে এটাই বোঝা যায় যে অভিভাবক বা বাবা-মায়েরও কাউন্সিলিং অবশ্যই দরকার। যদি স্কুলের চাপ ক্রমবর্ধমান হয় আর সব অভিভাবক-শিক্ষক সম্মেলনেই যদি এই আলোচনাই হয় যে, ছেলেমেয়েরা কত ভালো অথবা খারাপ করছে তাদের ক্লাসে, যদি শিক্ষকরা অনবরত ছাত্রছাত্রীর মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করেন এবং আবেগের দিক ও মানসিক দিকগুলিকে অবহেলা করেন, তা হলে কোনও কিছুই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না। সবার প্রথমে স্কুলগুলিকে এগিয়ে আসতে হবে। হয়তো বা বাচ্চাদের সাথে সাথে বাবা-মায়েদেরও কাউন্সিলিং করাতে হবে স্কুলগুলিকে।

পথশিশু ও পলাতক শিশু : প্রচলিত ধারণা ও বাস্তব

প্রচলিত ধারণা: শুধুমাত্র দরিদ্র পরিবারের শিশুরাই বাড়ি থেকে পালিয়ে পথশিশুতে পরিণত হয়। যে সব শিশু রাস্তায় থাকে তারাই শুধুমাত্র খারাপ হয়।

বাস্তব : যে কোনও শিশুই সঠিক দেখাশোনার অভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারে। প্রত্যেকটি শিশুরই মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে এবং কোনও অভিভাবক / পরিবার / স্কুল / গ্রাম যদি তাকে তার এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তা হলে তারা তাদের বাচ্চাকে হারাতে পারে।

পথশিশুদের অধিকাংশই বাড়ি থেকে পালিয়ে আসে । এই শিশুরা বাড়ি ছাড়ে বিভিন্ন কারণে। কখনও ভালো জীবনযাত্রার আশায়, কখনও বা বড় শহরের আকর্ষণে, কখনও আবার লোভের বশবর্তী হয়ে, কখনও বা কঠিন শিক্ষা ব্যবস্থার চাপে বাড়ির অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এরা বাড়ি ছেড়ে শহরে আসে ও তাদের জীবন আরো দুর্বিষহ হয়।

পথশিশুরা কখনওই খারাপ হয় না, পরিস্থিতির চাপে তারা খারাপ হয়।

এই শিশুরা অনেক সময়েই দু’বেলা খাবার পর্যন্ত জোগাড় করে উঠতে পারে না। এবং এরা অক্ষমতার কারণে অত্যাচারিত হয়। এক বার রাস্তায় এলে তারা বিভিন্ন ভাবে শোষিত হতে শুরু করে এবং সমস্যায় পড়ে। অপেক্ষাকৃত বড় বয়সের বাচ্চাদের সংস্পর্শে ছোট বয়সের বাচ্চারা এলে তারা কাগজ কুড়ানো বা অন্য কোনও সহজ উপার্জনের পথ নেয় বা বিভিন্ন বেআইনি কাজে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে যেমন পকেটমারি, ভিক্ষে করা, মাদক দ্রব্যের আদান প্রদান করা।

শিশুর বাড়ি থেকে পালায় বিভিন্ন কারণে-

  • জীবনে উপযুক্ত সুযোগ পাওয়ার জন্য।
  • বড় শহরের চাকচিক্য।
  • বন্ধুত্বের জন্য।
  • পরিবারে খারাপ সম্পর্কের জন্য।
  • বাবা-মা দেখাশোনা না করায়।
  • শিক্ষক ও বাবা-মায়ের মারের ভয়ে।
  • যৌন নিপীড়নের জন্য।
  • জাতি বৈষম্যের জন্য।
  • লিঙ্গ বৈষম্যের কারণে।
  • শারীরিক অক্ষমতার কারণে।
  • এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত হওয়ার জন্য।

মৌলানা আজাদ কলেজের ডিপার্টমেন্ট অফ কমিউনিটি মেডিসিন এবং সাইক্রিয়াট্রির শিশু চিকিৎসক দীপ্তি পাগড়ে, জি. এস. মিনা, আর. সি. জিলোহা এবং এম. এম. সিং, “পর্যবেক্ষণ হোমে থাকা যৌন নিপীড়নের শিকার পথশিশুরা” নামে ২০০৩-২০০৪ সালে দিল্লিতে একটি তথ্য নির্ভর গবেষণা করেছিলেন। এতে দেখা যায়, বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা বালকদের মধ্যে শতকরা ৩৮.১ শতাংশ শিশু যৌননিগ্রহের শিকার। ডাক্তারি পরীক্ষায় দেখা গেছে ৬১.১ শতাংশের শরীরে অত্যাচারের চিহ্ন রয়েছে, ৪০.২ শতাংশ শিশুর ব্যবহারে যৌন নিপীড়নের প্রভাব পড়েছে। জোর করে যৌন সংসর্গ করা হয়েছে ৪৪.৪ শতাংশ শিশুর সঙ্গে। ২৫ শতাংশ শিশু যৌন রোগের শিকার। অচেনা লোকেরাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন করেছে ।

এইচআইভি/এইডস : প্রচলিত ধারণা ও বাস্তব

প্রচলিত ধারণা : এইচআইভি/এইডস প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা। শিশুদের এ বিষয়ে জানার দরকার নেই। এইচআইভি/এইডস, প্রজননকালীন স্বাস্থ্য, যৌনতা ইত্যাদি বিষয়ে শিশুদের জানানো মানে তাদের মন দূষিত করা। এইচআইভি/এইডস সংক্রমণের ইতিহাস আছে এমন কোনও পরিবারের শিশুকেই শুধুমাত্র সতর্ক রাখা দরকার এবং যতটা সম্ভব দূরে রাখা দরকার যাতে এইচআইভি/এইডস ছড়িয়ে না পড়ে।

বাস্তব: এইচআইভি/ এইডস আক্রান্তদের কখনওই, বয়স, চামড়া, রঙ, জাত, শ্রেণি, ধর্ম, ভৌগোলিক স্থান, আদর্শের নীচতা, ভালো বা খারাপ কাজ প্রভৃতি দ্বারা পার্থক্য করা যায় না। সব মানুষই এইডস-এ আক্রান্ত হতে পারে।

এইচআইভি অর্থাৎ হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস শরীরে এইডস রোগের সৃষ্টি করে। এইচআইভি পজিটিভ যে কোনও মানুষের শরীরের তরল, যেমন বীর্য, স্ত্রীযোনি থেকে নির্গত তরল, রক্ত ও মায়ের দুধ থেকে সংক্রমণ ঘটতে পারে। এইচআইভি ইনজেকশনের সূচে যদি এইডস আক্রান্ত রোগীর রক্ত থাকে এবং সেই সূচ যদি ইনজেকশনের সাহায্যে ওষুধ নেওয়ার ক্ষেত্রে বা উল্কি আঁকার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় তা হলেও এইডস হতে পারে।

হাজার হাজার শিশু আজ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবেএইচআইভি/এইডস-এর শিকার। বাবা-মায়ের অকাল মৃত্যুর কারণে বাচ্চারা অনাথ হয়ে যায়, অভিভাবকদের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়।

মায়ের কাছ থেকে শিশুর কাছে এই রোগ পরিবাহিত হয় সব থেকে বেশি। যে হারে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের হার বাড়ছে তার ফলে শিশুরা এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে সব থেকে বেশি। ছোট শিশুদের মধ্যে মাদক দ্রব্যের প্রতি আসক্তি আরও একটি ভয়াবহ সমস্যা। এমতবস্থায় শিশুদের এইচআইভি/এইডস সম্পর্কে না জানানোটা মোটেই সুখকর হবে না এবং এই মারণ রোগ থেকে যাতে তারা নিজেদের রক্ষা করতে পারে তাদের সেই অধিকার দেওয়া উচিত।

এশিয়ার মধ্যে ভারতবর্ষে এইচআইভি /এইডস-এ আক্রান্তের সংখ্যা সব থেকে বেশি । ভারতের পরেই রয়েছে চিন। ইউএনএইডস এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের ০-১৪ বছর বয়সি বাচ্চাদের মধ্যে ১ লক্ষ ৬০ হাজার শিশু এইচআইভি পজিটিভ।

সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কেরলের পারাপ্পানগারির একটি সরকারি প্রাইমারি স্কুলে, অভিভাবক এবং শিক্ষক অ্যাসোশিয়েসন এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে, বাবা এইডস-এ মারা গেছে বলে ছয় বছরের ববিতা রাজকে স্কুল করতে দেওয়া হয়নি। সমাজকর্মী এবং স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যস্থতা এবং মেডিক্যাল সার্টিফিকেট অনুযায়ী মেয়েটির শরীরে এইচআইভির জীবাণু নেই, এটা জানানো সত্ত্বেও স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি নেয়নি। স্থানীয় সরকারি স্কুলও একই আচরণ করেছে।

উৎস : ফিউচার ফরসেকেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, পৃ. ৭৩, ২০০৪

এটা আমাদের বোঝা উচিত যে ছোঁয়াছুয়ির দ্বারা এইচআইভি সংক্রমিত হয় না। অথবা সংক্রমিত শিশুর পাশে বসলে বা চুমু খেলে, জড়িয়ে ধরলে বা খেলাধূলা করলেও সংক্রমণ হয় না।

এটা সত্য যে শিশুদের এইচআইভি/এইডস, প্রজননকালীন স্বাস্থ্য, যৌনতা ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষিত করার জন্য সব সময় তাদের সুবিধা ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মনের কথা ভেবে তাদের মতো করে কথা বলতে হবে। আসল কথা আমরা নিজেরাই ঠিক করে উঠতে পারি না শিশুদের সঙ্গে এ বিষয়ে কী ভাবে কথা বলব, তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে নিজেরাই অস্বস্তি বোধ করি। তাই বিষয়টাকে আমরা এড়িয়ে যেতে চাই। তার ফলে শিশুরাও বিষয়টা এড়িয়ে যায় । তাই জীবনশৈলী শিক্ষার বিষয়টা অবহেলা না করে আমাদের খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। যৌন শিক্ষা এর মধ্যেই পড়ে।

এইচআইভি/এইডস সম্পর্কে জনসাধারণের সম্যক ধারণা ছিল না বলে, অতীতে পরিবারের কেউ এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত হওয়ায় অনেক স্কুল থেকে বাচ্চাদের বের করে দেওয়া হত । অথবা যদি কখনও শোনাও গিয়ে থাকত, কোনও শিশুর পরিবারের কোনও ব্যাক্তি এইডস আক্রান্ত, তা হলে পরে এ কথা ভুল প্রমাণিত হলেও কেউ বিশ্বাস করত না এবং শিশুটিকে আলাদা করে দেখা হত। কিন্ত্ত ভারতীয় সংবিধান সব সময় সমানাধিকারের কথা বলে এবং যে কোনও রকমের ভেদাভেদ শাস্তিযোগ্য অপরাধ, একথাও বলে।

এইচআইভি পজিটিভ ব্যক্তি যদি সঠিক চিকিত্সা করান তবে বহু দিন পর্যন্ত তিনি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী থাকবেন ও তার থেকে এই রোগের জীবাণু অন্য ব্যক্তির দেহে সংক্রমিত হবে না। যদি কোনও শিশু সত্যি রোগে আক্রান্ত হয় ও তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয় তবে সেই শিশু দেখাশোনার অভাবে ও চিকিত্সার অভাবে অন্যত্র সংক্রমণ ঘটাবে। রোগীকে আলাদা করে দিলে এই রোগের সংক্রমণ এড়ানো যাবে না।

জাতপাতের ভেদাভেদ : প্রচলিত ধারণা ও বাস্তব

প্রচলিত ধারণা: অস্পৃশ্যতা, জাতপাতের ভেদাভেদ আমাদের সমাজে এখন আর নেই বললেই চলে। কোনও ক্ষেত্রেই দলিত সম্প্রদায় / তফশিলি জাতি উপজাতির ছাত্রছাত্রীরা কোনও রকম সমস্যা বোধ করেন না কারণ সরকার তাদের জন্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা শুরু করে তাদের চলার পথ সহজ করে দিয়েছেন।

বাস্তব : এটা কখনওই সত্য নয়। এক জন মানুষ খুব ছোট বয়সেই জাতি বৈষম্যের মুখোমুখি হয়। স্কুলে বা খেলার মাঠে, হাসপাতালে, এ রকম বিভিন্ন জায়গায় জাতপাতের বিভেদের সম্মুখীন হতে হয়। তফসিলি জাতি/উপজাতির মতো সমাজের পিছিয়ে থাকা, গরিব মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অধিকার দেওয়ার মধ্য দিয়েই এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এই অধিকারগুলির মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, শিশু শ্রমিকদের জন্য কর্মসূচি, হাতে করে জঞ্জাল পরিষ্কারের মতো অবমাননাকর কাজের অবসান ঘটানো ইত্যাদি।

প্রতিবন্ধকতা : প্রচলিত ধারণা ও বাস্তব

প্রচলিত ধারণা : শারীরিক প্রতিবন্ধকতা একটা অভিশাপ। পঙ্গু শিশুর কোনও ভবিষ্যত নেই, এ ধরনের শিশুরা পরিবারের বোঝা। অর্থনৈতিক ভাবে তারা অক্ষম তাই তাদের লেখাপড়া শেখার কোনও দরকার নেই। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শারীরিক ভাবে অক্ষম ব্যক্তিরা কোনও দিন সেরেও ওঠে না।

বাস্তব : শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে অতীতের কাজের কোনও সম্পর্ক নেই। এটা এক ধরনের বিকৃতি যা মায়ের গর্ভে শিশু থাকার সময় অযত্নের কারণে হতে পারে, বা বংশগত কারণেও এই বিকলাঙ্গতা আসতে পারে। প্রয়োজনীয় সময়ে ডাক্তারি সাহায্যের অপ্রতুলতা, ওষুধপত্রের অভাব, দুর্ঘটনা বা আঘাতজনিত কারণেও মায়ের গর্ভে থাকাকালীন শিশু বিকলাঙ্গ হয়।

শারীরিক ও মানসিক ভাবে পঙ্গু ব্যক্তি সব সময়ের জন্য দয়া ও করুণার পাত্র হয়। আমরা ভুলে যাই যে পঙ্গু বিকলাঙ্গ মানুষের করুণার চাইতে বেশি দরকার অধিকার ও সহমর্মিতার।

প্রতিবন্ধকতাকে আমাদের সমাজে কলঙ্কস্বরূপ দেখা হয়। একটি পরিবারে মানসিক ভাবে অসুস্থ কেউ থাকলে সেই পরিবারকে পরিত্যাগ করা হয়, এবং তাকে সমাজে হেয় জ্ঞান করা হয় । শিশুর উন্নতির জন্য সব রকম অবস্থাতেই প্রত্যেকটি শিশুর শিক্ষার প্রয়োজন। সেই শিশু যদি প্রতিবন্ধীও হয় তবুও এটা সত্য। কারণ এর দ্বারাই শিশুর সার্বিক বিকাশ সম্ভব।

প্রতিবন্ধী শিশুর বিশেষ যত্নের ও দেখাশোনার প্রয়োজন। যদি তারা সঠিক সুযোগ পায় তবে তারাও জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারে। প্রতিবন্ধকতা তখনই জীবনে দুঃখ বয়ে আনে যদি প্রতিবন্ধী শিশুর প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করতে আমরা ব্যর্থ হই।

প্রতিবন্ধী শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে যে যে বাধার শিকার হয়

  • প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য বিশেষ স্কুলের অভাব।
  • প্রতিবন্ধী শিশুরা ধীরে শেখে, কিন্তু স্কুল সে জন্য বিশেষ শিক্ষক নিয়োগ করে না, যারা ওই শিশুদের বিশেষভাবে দেখাশোনা করতে পারে।
  • সহপাঠীদের অমানবিক আচরণ। শারীরিক ও মানসিক ভাবে প্রতিবন্ধী শিশুরা সবসময় ব্যঙ্গবিদ্রুপের শিকার হয়, তারা ধীরে শেখে বলে বা তাদের শারীরিক বিকৃতি রয়েছে বলে।
  • স্কুলগুলিতে শারীরিক ভাবে অক্ষমদের উপযোগী পরিকাঠামো থাকে না। রাম্প, বিশেষ ধরনের চেয়ার বা তাদের উপযোগী শৌচাগারও তারা পায় না।

সঠিক শিক্ষা পদ্ধতির সাহায্যে বিকলাঙ্গ শিশুদের এমন কিছু পদ্ধতি শেখানো সম্ভব, যা তাদের মর্যাদার সঙ্গে ভদ্র জীবনযাপন করতে সাহায্য করবে।

আরও বলা যেতে পারে যদি খুব তাড়াতাড়ি অসুখ ধরা পড়ে, অধিকাংশ প্রতিবন্ধকতাই সেরে ওঠে বা দূরারোগ্যতাকে এড়াতে পারে। মানসিক প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়।

2.98484848485
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top